Todays Date : | Bengali
ad728

আন্তর্জাতিক সীসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আইসিডিডিআর,বি’র দেশব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি

Reporter information : News2
  • News Release Date : Nov 8, 2026
  • How Many People See: 74
Images Caption : আন্তর্জাতিক সীসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আইসিডিডিআর,বি’র দেশব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি


প্রতিপাদ্য: শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ

মোঃ মন্নান ঃপটুয়াখালী কলাপাড়া।
অক্টোবর ২০২৬: সীসা দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের সীসার সংস্পর্শ থেকে সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি দেশব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করছে। আন্তর্জাতিক সীসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে গৃহীত এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের ১৭টি জেলার ২৫টি উপজেলায় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি জনবহুল এলাকায় তরুণদের সম্পৃক্ত করে লিফলেট বিতরণ ও সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।

প্রতি বছর ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সীসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ পালন করা হয়। এ বছরের কর্মসূচিতে সীসা দূষণের উৎস শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য সীসা দূষণ গুরুতর হুমকি

সীসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু, যার মানবদেহে কোনো উপকারী ভূমিকা নেই। সীসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও আচরণে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া কিডনি, হাড়সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সীসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।

সাধারণত সীসাযুক্ত ধুলা বা ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ এবং দূষিত খাবার, পানি বা ধুলা মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশের ফলে মানুষ সীসার সংস্পর্শে আসে। বিশেষ করে শিশুরা মেঝে বা মাটিতে খেলার সময় হাত ও খেলনার মাধ্যমে সীসাযুক্ত ধুলা মুখে নিতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে জমে থাকা সীসাও গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে।

সীসার বিষক্রিয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তীব্র বিষক্রিয়ায় খিঁচুনি বা অচেতনতার মতো গুরুতর উপসর্গও হতে পারে। সীসার সংস্পর্শের আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে সীসার মাত্রা বা ব্লাড লেড লেভেল (BLL) পরীক্ষা করা যেতে পারে।

জাতীয় জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। অর্থাৎ, এ বয়সী শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সীসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকায় দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৫০০ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সব শিশুর রক্তে শনাক্তযোগ্য মাত্রায় সীসা পাওয়া যায়। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি ছিল। গবেষণার ফলাফল পুরো ঢাকা শহরের শিশুদের প্রতিনিধিত্ব না করলেও নগর এলাকায় সীসা দূষণের উৎস ও প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

সীসা দূষণ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার

আন্তর্জাতিক সীসা দূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সচেতনতামূলক সেমিনারটি পরিচালনা করেন আইসিডিডিআর,বি’র ভলান্টিয়ার মো. আব্দুল মান্নান। সেমিনারে সীসা দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি, দূষণের সম্ভাব্য উৎস শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সীসা দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেমিনারে সীসা দূষণ প্রতিরোধ বিষয়ে বক্তব্য দেন মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সীসা দূষণ একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট, যা বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সীসার সংস্পর্শের কোনো মাত্রাকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না। তাই সীসা দূষণের উৎস শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মধ্যে সীসা দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য, পানির উৎস, গৃহস্থালি সামগ্রী ও শিল্পবর্জ্যে সীসার উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।”

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে প্রধান শিক্ষকের আহ্বান

সেমিনারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। সীসা দূষণ সম্পর্কে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন করা সময়ের দাবি। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের অন্যদেরও সচেতন করতে পারবে।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিষ্কার পরিবেশে খেলাধুলা করা এবং ধুলাবালিযুক্ত স্থান থেকে সতর্ক থাকার মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক এবং সমাজের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা শিশুদের জন্য সীসামুক্ত ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।”

দূষণের উৎস শনাক্তকরণে গবেষণার ভূমিকা

বাংলাদেশে সীসা দূষণের উৎস শনাক্ত করতে আইসিডিডিআর,বি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা গর্ভবতী নারীদের রক্তে সীসার উপস্থিতির সম্ভাব্য উৎস অনুসন্ধান করেন। এ উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য ও আশপাশের পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করা হয়। সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে ছিল হলুদ, সীসা দিয়ে ঝালাই করা কৌটা এবং খাদ্য প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত কিছু মাটি ও কাদামাটিজাতীয় উপকরণ।

গবেষণায় সীসার আইসোটোপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে রক্তে সীসার উপস্থিতির সঙ্গে সীসাযুক্ত ভেজাল হলুদের সম্পর্ক শনাক্ত করতে সহায়তা পাওয়া যায়। গবেষকদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭–১৮ সালে ছয়টি জেলা থেকে সংগ্রহ করা হলুদের নমুনা পরীক্ষা করে সাতটি জেলায় সীসা দূষণ শনাক্ত করা হয়। কিছু নমুনায় সীসার মাত্রা প্রযোজ্য জাতীয় সীমার সর্বোচ্চ ৫০০ গুণ পর্যন্ত ছিল। হলুদের রং উজ্জ্বল করতে ব্যবহৃত সীসাযুক্ত রঞ্জক পদার্থ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বাজারে হলুদ বিক্রেতা ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের সচেতন করা, গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নজরদারি ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে হলুদে সীসা দূষণ কমার তথ্য পাওয়া যায়। এ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, দূষণের উৎস শনাক্ত করে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে মানুষের সীসার সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।

পরিবেশ ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ঢাকার শিশুদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় ব্যাটারি রিসাইক্লিংসহ সীসাসংশ্লিষ্ট শিল্পদূষণ, ঘরের ধুলা এবং দূষিত গৃহস্থালি পণ্যের সঙ্গে রক্তে সীসার মাত্রার সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্যবহৃত সীসাযুক্ত ব্যাটারি অনিরাপদভাবে ভাঙা ও সীসা গলানোর ফলে দূষণ আশপাশের মাটি, ধুলা ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দূষিত মাটিতে খেলাধুলা করা শিশুরা এভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে।

সীসার সংস্পর্শ কমাতে নিয়মিত হাত ধোয়া, শিশুদের খেলার স্থান পরিষ্কার রাখা এবং ভেজা কাপড় দিয়ে মেঝে ও আসবাবপত্র মোছার মতো অভ্যাস সহায়ক। তবে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পণ্যে সীসার উপস্থিতি পরীক্ষা, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং সীসাযুক্ত উপকরণের নিরাপদ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুদের সুরক্ষায় সবার দায়িত্ব

Print News Photo Card
ad728
Comment Box

Share The News..

More news like this..