Todays Date : | Bengali
ad728

শীতের আগমনী বার্তায় তাড়াশে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি

Reporter information : News2
  • News Release Date : Nov 8, 2026
  • How Many People See: 44
Images Caption : শীতের আগমনী বার্তায় তাড়াশে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি



মোঃআলামিন হোসেন, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

শীত এখনো পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। তবে প্রকৃতিতে মিলছে ঋতু পরিবর্তনের আগাম বার্তা। দিনের গরমের পর রাতের শেষ ভাগে অনুভূত হচ্ছে শীতের আমেজ। ভোরে ঘাস ও আমন ধানের পাতায় জমছে শিশিরবিন্দু। এমন আবহেই সিরাজগঞ্জের তাড়াশে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। শীত মৌসুমকে সামনে রেখে খেজুরগাছ পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় গাছিরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশ, জমির আইল ও পুকুরপাড়ে থাকা খেজুরগাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন গাছিরা। গাছের মাথা ছেঁটে নির্দিষ্ট অংশ প্রস্তুত করা হচ্ছে রস সংগ্রহের জন্য। স্থানীয় ভাষায় এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কাম দেওয়া’। গাছ প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে গাছে গাছে বাঁধা হবে মাটির হাঁড়ি। এরপর রাতভর জমা হওয়া রস সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হবে শীতের ঐতিহ্যবাহী কর্মযজ্ঞ।
গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রথমে গাছের মাথা পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট অংশ কেটে প্রস্তুত করতে হয়। পরে কয়েক ধাপে ওই অংশ কেটে নল লাগানো হয়। নলের নিচে বেঁধে দেওয়া হয় মাটির হাঁড়ি। রাতভর হাঁড়িতে জমা হওয়া রস ভোরে সংগ্রহ করে বাড়িতে নেওয়া হয়। এরপর সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় দানা ও লালি গুড়।
উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের রানীদিঘী গ্রামের গাছি ইয়াছিন বলেন, সাধারণত কার্তিক মাসে খেজুরগাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়। এবার শীতের আগমনী বার্তা পেয়ে কিছুটা আগেই গাছ প্রস্তুত করছেন তাঁরা। একটি গাছের ডালপালা পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের উপযোগী করতে প্রায় এক দিন সময় লাগে।
তিনি জানান, রস সংগ্রহের জন্য সাধারণত ৬ থেকে ১০ লিটার ধারণক্ষমতার মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। হাঁড়ির ভেতরে চুনের প্রলেপ দেওয়া হলে রস সংরক্ষণে সুবিধা হয়। তবে কাঁচা খাওয়ার জন্য রস সংগ্রহ করা হলে হাঁড়িতে চুন দেওয়া হয় না।
ইয়াছিনের ভাষ্য, একটি খেজুরগাছ থেকে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস রস পাওয়া যায়। গাছের আকার ও অবস্থাভেদে প্রতিদিন একটি গাছ থেকে এক থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব। তিন দিন রস সংগ্রহের পর পরবর্তী তিন দিন বিরতি দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পালি দেওয়া’।
গাছ থেকে রস সংগ্রহের কর্মব্যস্ততা শুরু হয় বিকেল থেকেই। বিকেল ৩টার দিকে গাছে গাছে হাঁড়ি বাঁধার কাজ শুরু করেন গাছিরা। পরদিন ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে কুয়াশা ঘেরা পরিবেশে সংগ্রহ করেন রাতভর জমে থাকা রস। পরে বাড়িতে এনে রস ছেঁকে বড় পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়। আগুনের তাপে রস ঘন হয়ে লালচে রং ধারণ করলে তৈরি হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড়।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গাছি ইয়াছিন বলেন, বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। একসময় ১০০ থেকে ১২০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে করেন ৫০ থেকে ৬০টি গাছ থেকে। এসব রস দিয়ে দানা ও লালি গুড় তৈরি করেন। এক কেজি গুড় উৎপাদনে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি রস প্রয়োজন হয়।
নিজস্ব খেজুরগাছ না থাকায় অন্যের গাছ চুক্তিতে নিয়ে রস সংগ্রহ করতে হয় তাঁকে। বিনিময়ে গাছের মালিককে প্রতি গাছের জন্য দুই থেকে তিন কেজি গুড় দিতে হয়। ছোটবেলা থেকে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখনো ছাড়তে পারেননি পূর্বপুরুষের এই পেশা। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সক্ষমতা কমে আসছে। অন্যদিকে এলাকায় খেজুরগাছের সংখ্যাও আগের তুলনায় কমছে। সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এ পেশা টিকিয়ে রাখা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাঁর।
একই ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন উপজেলার অন্য গাছিরাও। গাছি মোতালেব, শরিফুল, আজমল ও জাহিদুল জানান, এবার তাঁরা প্রত্যেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে দু-একজনের নিজস্ব খেজুরগাছ থাকলেও অধিকাংশকেই অন্যের গাছ চুক্তিতে নিতে হয়। গাছপ্রতি মালিককে সাত কেজি লালি গুড় অথবা এক হাজার টাকা দিতে হয়। গাছ প্রস্তুতের কাজ প্রায় শেষ। এখন শীত বাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, শীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে কৃষকেরা বাড়তি আয় করতে পারেন। খেজুরগাছের জন্য আলাদা করে তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। তাই বাড়ির আশপাশে, জমির আইলে, পুকুরপাড়ে ও সড়কের পাশে খেজুরগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে খেজুরবাগান গড়ে তুলতে পারলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াশের গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়েছে খেজুরের রস ঘিরে কর্মচাঞ্চল্য। গাছিরা এখন ব্যস্ত গাছ প্রস্তুতিতে। তাঁদের প্রত্যাশা, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছে গাছে বাঁধা হবে মাটির হাঁড়ি। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে শুরু হবে রস সংগ্রহ। সেই রস থেকে তৈরি গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে গ্রামবাংলার শীতের চিরচেনা ঐতিহ্য।

Print News Photo Card
ad728
Comment Box

Share The News..

More news like this..